 |
| পাঁচটি ক্ষেত্রে আমরা আল্লাহর প্রতি আশাবাদী। |
আলহামদুলিল্লাহ, আমরা আল্লাহর প্রশংসা করি। তিনিই একমাত্র প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য। আমরা তাঁর প্রশংসা করি আমাদেরকে হেদায়েত দেওয়ার জন্য এবং সৃষ্টি করার জন্য। আমরা তাঁর প্রশংসা করি আমাদেরকে ইসলামের উপহার দেওয়ার জন্য। আমরা তাঁর প্রশংসা করি আমাদেরকে দেওয়া তাঁর প্রতিটি নেয়ামতের জন্য— যে নেয়ামতগুলো আমরা শনাক্ত করতে পারি এবং যেগুলো শনাক্ত করতে পারি না।
আমরা তাঁর নিকট দুআ করি তিনি যেন তাঁর সালাত এবং সালাম প্রেরণ করেন তাঁর প্রতি— যাকে রাহমাতাল্লিল আলামিন করে পাঠানো হয়েছে।
প্রিয় মুসলিম, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা সমগ্র কুরআন জুড়ে আমাদেরকে তাঁর ব্যাপারে সচেতন থাকতে বলেছেন। তিনি যেমন বলেছেন, يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ - “হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে যেমন ভয় করা উচিৎ ঠিক তেমনিভাবে ভয় করতে থাক। এবং অবশ্যই মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না।” (3:102)
আজ আমরা যে যুগে বাস করছি, কখনো কখনো এমন হতে পারে যে পরিস্থিতি আমাদের পুরোপুরি হতচকিত করে দেয়। আমরা কখনো দুঃখ ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ি, কখনো হতাশ হয়ে পড়ি। প্যান্ডামিকের বাস্তবতার দিকে তাকিয়ে, অর্থনৈতিক অবস্থার দিকে তাকিয়ে, রাজনৈতিক অবস্থার দিকে তাকিয়ে, ইসলাম বিদ্বেষের দিকে তাকিয়ে— আমরা খুব সহজেই হতাশ হয়ে পড়তে পারি। মনের অবস্থা এমন হয়ে পড়তে পারে— কোথাও তো কোনো আশার আলো দেখছি না।
ঠিক এই রকম সময়েই আমাদের নিজেদেরকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন আমাদের ধর্মের অন্যতম একটি স্তম্ভ সম্পর্কে। ঈমানের একটি স্তম্ভ সম্পর্কে, যা একেবারে পরিষ্কারভাবে কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে। আর আরবি পরিভাষাটি মনে রাখাও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। যদিও দুর্ভাগ্যক্রমে আমরা অনেকেই এই পরিভাষাটির সাথে পরিচিত নই। সেই পরিভাষাটি হলো, আর-রজা।
আর-রজার ধারণাটি ঈমানের মৌলিক স্তম্ভ। এটি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার প্রতি বিশ্বাসের সাথে সম্বন্ধযুক্ত। এর অর্থ হলো, আমরা আশাবাদী এবং আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা সম্পর্কে আমরা সবচেয়ে ভালো ধারণা পোষণ করি। এর মানে আমরা মনের মাঝে ইতিবাচকতার আকাঙ্ক্ষা লালন করি। রজা বলতে এটাই বুঝায়। আপনি সবচেয়ে সেরাটার আশা করছেন। সর্বোত্তম ফলাফলের আশা করছেন। এই রজার ধারণাটি এতোই গুরুত্বপূর্ণ যে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা একে ঈমানের একটি বৈশিষ্ট্য হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। 'ইয়ারজু নাল আখিরাহ', তাদের আখিরাতের প্রতি আশা রয়েছে। يَرْجُونَ رَحْمَتَ اللهِ - তারা আল্লাহর রহমতের প্রত্যাশী।
রাসূলের সিরাত থেকেও শিক্ষা নেওয়া উচিত আমাদের। মুসলমানদের জন্য অন্যতম একটি হতাশাজনক ব্যাপার ছিল ওহুদের দুঃখজনক ঘটনা। এটা ছিল এমন এক ট্রাজেডি, যার ফলে সাহাবারা প্রচণ্ড এক ধাক্কা খায়। এটা ছিল এমন এক ট্রাজেডি যা শ্রেষ্ঠ সাহাবাদের মাঝে হতাশার সৃষ্টি করে। আল্লাহ্ আজ্জা ওয়া জাল্লা স্মরণ করিয়ে দেন, তাদেরকে উৎসাহ প্রদান করেন, তাঁদেরকে প্রশান্তি দান করেন, সূরা আলে ইমরানের এক জায়গায় তিনি বলেন, وَلَا تَهِنُوا - আশা ছেড়ে দিও না। وَلَا تَحْزَنُوا - এবং দুঃখ করো না।(৩:১৩৯) এরপর আল্লাহ্ আজ্জা ওয়া জাল্লা বর্ণনা করেন, তোমরা কীভাবে দুঃখ করতে পারো যখন وَتَرْجُونَ مِنَ اللهِ مَا لَا يَرْجُونَ - তোমাদের আল্লাহর কাছে আশা আছে, আর তাদের আল্লাহর কাছে কোনো আশা নেই। (৪:১০৪)
Read more: তরুণ-তরুণীরা কেন জীবনের কোনো অর্থ খুঁজে পাচ্ছে না?
আক্ষরিক অর্থেই— দুর্যোগের মুহূর্তে, দুঃখের সময়ে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বিশ্বাসীদের বলছেন কীভাবে তোমরা নিজেদের অবস্থাকে ওদের মত মনে করো? যখন তোমাদের আল্লাহর প্রতি রজা আছে, এবং তাদের আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার প্রতি কোনো রজা নেই।
তো, এই রজা থাকার মানে কী? রজার কি কি ক্যাটাগরি রয়েছে? আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার প্রতি এই রজা থাকলে কী হয়? আজকের খুৎবায় এই কয়েকটি পয়েন্টের উপর সংক্ষেপে আলোচনা করবো। ইবনে কাইয়েম রজাকে সংজ্ঞায়িত করেছেন এভাবে— আল্লাহর রহমতের অসীম ব্যাপ্তি আপনার উপরেও প্রভাব ফেলবে। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার অসীম দয়ার প্রতি বিশ্বাস রাখা। এবং বিশ্বাস করা যে, আমার জীবনেও আল্লাহর রহমত প্রতিভাত হবে। এটাই রজার অর্থ। এমনকি এক লেখায় তিনি উল্লেখ করেন, রজা আল্লাহর প্রতি ঈমানের সাথে সম্পর্কযুক্ত। কারণ, তিনি প্রশ্ন করেন "আল্লাহর সুন্দর সুন্দর নাম এবং গুণাবলী সম্পর্কে জানার পরেও কেউ কিভাবে আল্লাহর প্রতি নিরাশ হতে পারে?" কেউ যখন জানে যে, আল্লাহ হলেন রহমান, আল্লাহ হলেন রহিম, আল্লাহ হলেন আল-বার, আল্লাহ হলেন কারীম, আল্লাহ হলেন আল-মুহসিন— এতো কিছু জানার পরেও কারো পক্ষে কিভাবে সম্ভব আল্লাহর প্রতি আশা হারিয়ে ফেলা। আল্লাহর প্রকৃতি-ই হলো ভালো এবং দয়ালু হওয়া।
যখন আমরা ঐশ্বরিক এই সমস্ত নামে বিশ্বাস করবো, যখন আমরা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার প্রতি বিশ্বাস করবো, তখন এমনিতেই আমাদের ভেতরে একটি ইতিবাচক শক্তি জাগ্রত হওয়ার কথা, একটি প্রত্যাশার অনুভূতি জেগে উঠার কথা। এ জন্যই রজা আল্লাহর প্রতি ঈমানের সাথে সম্বন্ধযুক্ত। আপনি যদি আল্লাহকে জানেন, তাহলে আল্লাহর প্রতি আশাবাদী হবেন। বিষয়টা এতোটাই সহজ। যদি আল্লাহর সুন্দর সুন্দর নামসমূহ এবং গুণাবলী সম্পর্কে জানেন, আপনি সবসময় ভবিষ্যতের ব্যাপারে আশা রাখবেন।
রজার বিভিন্ন ক্যাটাগরি রয়েছে। আজকের খুৎবায় শুধু পাঁচটি বিষয় তুলে ধরবো। অবশ্যই, এছাড়া আরও আছে। কিন্তু, মূলতঃ পাঁচটি ক্ষেত্রে আমরা আল্লাহর প্রতি আশাবাদী।
পাঁচটি ক্ষেত্রে আমরা আল্লাহর প্রতি আশাবাদী
আল্লাহর কাছে পুরস্কার আশা করা।
আমাদের ভালো কাজের জন্য আল্লাহর কাছে পুরস্কার আশা করা। আমরা যদি দান করি, আমাদের আশা আছে যে, আল্লাহ আমাদের এই দান কবুল করবেন এবং আমাদেরকে পুরস্কৃত করবেন। যদি মানুষের সাথে ভালো আচরণ করি, নামাজ পড়ি, রোজা রাখি, অর্থাৎ যে কোনো ভালো কাজই করি না কেন— আমাদের আশা আছে আল্লাহ আমাদেরকে এই সমস্ত কাজের জন্য পুরস্কার দিবেন। এর সর্বোচ্চ পর্যায় হলো, আল্লাহর জান্নায় রজা রাখা। এই আশা করা যে আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। প্রিয় মুসলিম ভাই এবং বোনেরা, কোনো ধরণের ব্যতিক্রম ছাড়াই আমাদের সবার জান্নাতে প্রবেশের আশা থাকা উচিত। যত পাপই আপনার থাকুক না কেন এই আশা পরিত্যাগ করবেন না। কারণ, আল্লাহর প্রকৃতি-ই হলো ক্ষমা করে দেওয়া। আমাদের রজা থাকা উচিত যে, আল্লাহ্ আমাদের ক্ষমা করে দিবেন এবং জান্নাত দান করবেন।
দ্বিতীয় ধরণের রজা—
আল্লাহ্ আমাদের পাপগুলো মাফ করে দিবেন।
সংক্ষেপে এটা নিয়ে ইতোমধ্যে বলে ফেলেছি— আর তা হলো, আল্লাহ্ আমাদের পাপ সমূহ ক্ষমা করে দিবেন। প্রথম ধরণের রজা হলো, আল্লাহ্ আমাদের ভালো কাজগুলো গ্রহণ করবেন এবং তার জন্য পুরস্কার দিবেন। আর দ্বিতীয় ধরণের রজা হলো, আল্লাহ্ আমাদের পাপগুলো মাফ করে দিবেন।
হ্যাঁ, প্রতিটি বিশ্বাসীর আল্লাহর দয়ার প্রতি আশা থাকা উচিত। আল্লাহ্ যে ক্ষমা করে দিবেন— আল্লাহর এই দয়ার প্রতি কখনো আশা ছেড়ে দিবেন না।
তাহলে প্রথম দুই ধরণের রজা হলো, আপনি আপনার পুণ্য কাজগুলোর জন্য আল্লাহর কাছে পুরস্কার আশা করেন। এবং আপনি আপনার পাপ কাজগুলোর জন্য আল্লাহর ক্ষমা আশা করেন।
এটি আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার প্রতি ঈমানের একটি মৌলিক দিক। _ _ _তৃতীয় ধরণের রজা,
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার সঙ্গে সাক্ষাতের আশা করা।
তৃতীয় ধরণের রজা হলো, পুণ্যবান ব্যক্তিদের প্রত্যাশা, ধার্মিক ব্যক্তিদের প্রত্যশা। এমন মানুষদের রজা যাদের সর্বোচ্চ পর্যায়ের ঈমান রয়েছে। তৃতীয় ধরণের রজা হলো, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার সঙ্গে সাক্ষাতের আশা করা। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার সাথে সাক্ষাৎ কামনা করা। রাসূল (স) বলেছেন, মান আহাব্বা লিকাআল্লাহি আহাব্বাল্লাহু লিকাআহু "যে ব্যক্তি আল্লাহর সাক্ষাৎ ভালোবাসে, আল্লাহও তার সাক্ষাৎ ভালোবাসেন।" কুরআন আমাদের বলে, يَرْجُوا۟لِقَآءَرَبِّهِ - তারা তাদের রবের সাক্ষাৎ আশা করে। (১৮:১১০) তারা আল্লাহর সাথে দেখা করার জন্য উদ্দীপ্ত। এই ধরণের রজা পোষণ করে সর্বোচ্চ পর্যায়ের ধার্মিক মানুষেরা— মুহসিন, মুত্তাকী মানুষেরা। তারা এমন এক পর্যায়ের ঈমানে পৌঁছেছে যে তারা আত্মবিশ্বাসী, একই সাথে অবশ্যই তাঁরা আল্লাহর শাস্তির ভয়ও করে। তাঁরা আত্মবিশ্বাসী যে, আমরা জান্নাতের আশা করছি। আমি আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালাকে দেখতে চাই। এটা হলো সর্বোচ্চ পর্যায়ের রজা।
আল্লাহ আমাকে এটা দান করবেন।
চতুর্থ এবং পঞ্চম এই দুনিয়া কেন্দ্রিক। প্রথম তিনটি ধর্মীয় বিষয় নিয়ে। আর চতুর্থ এবং পঞ্চম এই দুনিয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট।
চার, যখন এই দুনিয়াতে কোনো কিছু পাওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করবেন তখন এই আশা করা যে, আল্লাহ আমাকে এটা দান করবেন। আমাদের রাসূল (স) বলেন, Never make dua to Allah except that you are certain that Allah will give you what you are asking for. "যা চেয়ে আল্লাহর কাছে দুআ করছো আল্লাহ তোমাকে তা দিবেন— অন্তরে এই নিশ্চয়তা পোষণ করা ছাড়া কখনো দুআ করো না।" এটা রজা। অন্তরে আমার দৃঢ় বিশ্বাস আছে যে, আমি জানি আল্লাহ আমার দুআর জবাব দিবেন। এটাও উচ্চতম একটি পর্যায়। আপনার এই মনোভাব আছে যে, কিভাবে আস-সামি (যিনি সবকিছু শুনেন) আমার দুআ না শুনে থাকবেন, কিভাবে আর-রহমান আমার প্রয়োজন না দেখে থাকবেন। আর কিভাবে আল-কারীম(সুমহান দাতা)-র কাছে চাইলে আমাকে না দিয়ে থাকবেন।
তাহলে, আমরা দুয়া করবো সর্বোচ্চ পর্যায়ের আশা নিয়ে। আমরা আল্লাহর জবাব আশা করি। আর আমরা আত্মবিশ্বাসী যে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আমাদের দুআর উত্তর দিবেন। এটা ছিল রজার চতুর্থ ধরন।
আল্লাহ্ সহজ করে দিবেন।
আর শেষ ধরণের রজা হলো— এই আশা করা যে, আমাদের কষ্টকর পরিস্থিতি আল্লাহ্ সহজ করে দিবেন। বর্তমান পরিস্থিতি। চাকরি হোক, পরিবার হোক, করোনা হোক, যাই হউক না কেন— আশা এবং রজা থাকা উচতি যে, যে পরিস্থিতিতে আমি এখন আছি — যেটাই হোক না কেন— যে সমস্যার মোকাবেলা করছেন, যে সংকট আপনার জন্য ঝামেলা তৈরি করছে, ইনশাআল্লাহু তায়ালা খুব দ্রুত এর একটা পরিবর্তন ঘটবে। আজ না হলে কাল, কাল না হলে পরশু—এর সমাধান হবেই। আপনার সার্বক্ষণিক রজা(আশা) আছে যে, আমার সমস্যাপূর্ণ দিকটি একসময় আমার জন্য কল্যাণকর দিকে রূপান্তরিত হবে। আমার হতাশার কারণটি প্রত্যাশার কারণে রূপান্তরিত হবে। আমার দুঃখ একসময় সুখের কারণে পরিণত হবে। একজন বিশ্বাসীর অন্তর অফুরন্ত আশার উৎস। মুমিনের হৃদয় থেকে সর্বদা আশার আলো বিচ্ছুরিত হতে থাকে। কেন? কারণ, একজন বিশ্বাসীর প্রত্যাশা আসে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার উপর ঈমান থেকে।
এই প্রকারের রজার কথা কুরআনেও এসেছে। সুরাতুল ইসরাতে এক আলোচনার প্রেক্ষাপটে আল্লাহ্ বলছেন পিতামাতা বা গরীব আত্মীয়স্বজন যদি তোমার কাছে টাকাপয়সা চায় কিন্তু তোমার কাছে তা নেই, তখন...কুরআনে এসেছে وَإِمَّا تُعْرِضَنَّ عَنْهُمُ ابْتِغَاءَ رَحْمَةٍ مِّن رَّبِّكَ تَرْجُوهَا - যদি তোমাকে পাশ কাটাতে হয়, তারা যা চাচ্ছে তা দিতে অপারগ হওয়ার কারণে, কিন্তু তুমি এখনো আশা করছ 'তারজুহা' যে আল্লাহ্ তোমাকে পরে একসময় এই টাকা দান করবেন। অর্থাৎ, ব্যাপারটা হলো, আপনার কাছে টাকা নেই, কিন্তু আপনার পিতামাতা বা আত্মীয়স্বজন আপনার কাছে কিছু টাকা চাইছে, তখন কুরআন বলছে, তোমাকে যদি তাদের থেকে পাশ কাটাতে হয়, নম্রভাবে পাশ কাটাও। অভদ্র আচরণ করো না। ধমক দিয়ে বলো না "আমার কাছে টাকা নাই।" ভদ্রভাবে বলো, ইনশাআল্লাহ্ টাকা এলে দিবো। ابۡتِغَآءَ رَحۡمَۃٍ مِّنۡ رَّبِّکَ تَرۡجُوۡهَا - তুমি আল্লাহর রহমত কামনা করছ আর আশা করছ যে, আল্লাহ্ তোমাকে সেই রিজিক দান করবেন। যে টাকা এই মুহূর্তে তোমার কাছে নেই।
এ ধরণের 'রজা' হলো এই দুনিয়ার জন্য। এই 'রজা' বেতন বৃদ্ধির জন্য, এই 'রজা' ব্যাংকের একাউন্টে টাকা বাড়ার জন্য। আর এরজন্য আল্লাহ্ 'রজা' পরিভাষাটি ব্যবহার করেছেন। আল্লাহ্ বলছেন চিন্তা করো না, 'রজা' রাখো। তুমি পাবে। তুমি তোমার পিতামাতাকে দিতে পারবে ইনশাআল্লাহু তায়ালা। বদমেজাজি এবং ছোট লোকের মত আচরণ করো না।
তাহলে, দুনিয়ার জন্য আশা করার শুধু যে অনুমতি আছে তাই নয়, এটা বরং আমাদের বর্তমান পরিস্থিতির সাথে স্পষ্টভাবে সম্বন্ধযুক্ত, হতাশাজনক পরিস্থিতির সাথে সম্পর্কযুক্ত, অর্থনৈতিক সমস্যার সাথে সম্বন্ধযুক্ত, দাম্পত্য জীবনের দুঃখ কষ্টের সাথে সংযুক্ত; যেটাই হোক না কেন, আল্লাহর উপর ঈমান আমাদেরকে বলছে যে, আমাদের 'রজা' থাকা উচিত।
আর অবশ্যই 'রজার' বহুবিধ উপকারিতা রয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম হলো, স্পষ্টত আমাদের যখন রজা থাকে আমরা জীবন নিয়ে আশাবাদী হয়ে উঠি। যেটাই ঘটুক, আমরা আশায় বুক বাঁধি যে, ইনশাআল্লাহ্ আগামীকাল উত্তম হবে। এটা আমাদেরকে এক ধরণের ইতিবাচক শক্তি দান করে। রজা আমাদেরকে আমাদের ইবাদাতের ক্ষেত্রে সাহায্য করে। এটা আমাদেরকে সওয়াবের কাজ করার অনুপ্রেরণা দিয়ে যায়। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার নিকট দু'আ করার অনুপ্রেরণা দিয়ে যায়। আল্লাহর নিকট ক্ষমা ভিক্ষা করার অনুপ্রেরণা দিয়ে যায়। সর্বোপরি, এটা আপনাকে আরও উত্তম মানুষে পরিণত করে, জীবনের সকল ক্ষেত্রে। আপনার ইবাদাতে, অন্যদের সাথে ভালো আচরণ করার ক্ষেত্রে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার প্রতি আশাবাদী হওয়ার ক্ষেত্রে, দুনিয়ার চাপ মোকাবেলার ক্ষেত্রে। 'রজা' জীবনের সকল ক্ষেত্রে শুধু কল্যাণই নিয়ে আসে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, রজা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার জন্য আমাদের অন্তরে ভালোবাসা নিয়ে আসে, তাওয়াক্কুল নিয়ে আসে, এবং সর্বদা আল্লাহর নিকট বিভিন্ন জিনিস চাওয়ার প্রেরণা নিয়ে আসে।
অতএব, প্রিয় ভাই এবং বোনেরা, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার উপর ঈমানের অন্যতম মৌলিক একটি স্তম্ভ হলো 'রজা' বা আশাবাদী হওয়া। এটা এতো গুরুত্বপূর্ণ যে আমাদের আগেকার যুগের বহু স্কলার বলেন, আল্লাহ্ আজ্জা ওয়া জাল্লার ইবাদাত করা হয় মূলত তিনটি আবেগের উপর ভিত্তি করে। আল-হুব(ভালোবাসা), খাউফ(ভয়), রজা(আশা)।
আমরা আল্লাহর ইবাদাত করি, কারণ আমরা আল্লাহকে ভালোবাসি। আমরা আল্লাহর ইবাদাত করি, কারণ আমরা আল্লাহর শাস্তিকে ভয় করি। এবং আমরা আল্লাহর ইবাদাত করি, কারণ আমরা আল্লাহর প্রতি এবং তাঁর দয়ার প্রতি আশাবাদী।
রজা এতোটাই গুরুত্বপূর্ণ। এটা হয়ে উঠে আমাদের ঈমান এবং ইবাদাতের শীর্ষ স্তম্ভগুলোর একটি এবং অনুপ্রেরণার অন্যতম উপাদান। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আমাকে আপনাকে কুরআনের মাধ্যমে পবিত্র করুন। এবং তিনি আমাদেরকে তাঁদের অন্তর্ভুক্ত করুন যারা এর আয়াতগুলো বুঝে এবং নিজের জীবনে হালাল-হারাম বাস্তবায়ন করে। আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই, আপনাদেরও চাওয়া উচিত। কারণ, তিনি হলেন গাফুর এবং রহমান।
আলহামদুলিল্লাহ্, সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য। যিনি একক এবং অদ্বিতীয়। আমরা একমাত্র তাঁরই ইবাদাত করি। একমাত্র তাঁরই সাহায্য প্রার্থনা করি। তিনি নিপীড়িতের প্রভু, এবং তিনিই সেই সত্ত্বা যিনি দুর্বলের দুআর জবাব দিয়ে থাকেন।
প্রিয় মুসলিম, 'রজা' পরিভাষাটি একেবারে সঠিক একটি পরিভাষা। অন্যান্য পরিভাষাগুলোর বিপরীতে এর অবস্থান যেগুলো ইতিবাচক নয়। যেমন, তামান্নি বা তামান্না। এমনকি বাংলায়ও আমরা তামান্না ব্যবহার করি। কুরআনে এই পরিভাষাটি ব্যবহৃত হয়নি— সাধারণভাবে বলতে গেলে— এই বাস্তবতা এবং ধারণা বর্ণনা করার জন্য। 'রজা' এবং আশার জন্য ব্যবহৃত অন্যান্য পরিভাষাগুলোর মাঝে পার্থক্য কী? আপনারা সবাই জানেন, আরবি খুবই উন্নত একটি ভাষা। ইংরেজি একটি অ্যাডজেক্টিভের জন্য আরবিতে হয়তো দশটি শব্দ রয়েছে। আপনারা সবাই এ ব্যাপারে সচেতন।
তাহলে, আল্লাহ্ কেন 'রজা' পরিভাষাটি ব্যবহার করলেন এবং উদাহরণস্বরূপ, তামান্নি ব্যবহার করেননি? কারণ, 'রজা' হলো এমন ধরণের আশা যা একজনের কাজে-কর্মেও পরিবর্তন নিয়ে আসে। আর আরবি 'তামান্নি' হলো, শুধু একটি চিন্তা; যা আপনার জীবনে কোনো ধরণের পরিবর্তন নিয়ে আসে না। আমাদের শুধু তামান্নি থাকা উচতি নয়। কোনো চেষ্টা ছাড়া আশা থাকা উচিত নয়।
সুতরাং, মূল কথা হলো, আপনার যখন আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার উপর 'রজা' থাকবে, যখন আপনার খাঁটি আশা থাকবে, এটা আপনার জীবন পদ্ধতিতে প্রভাব ফেলবে। জীবনে একটা পার্থক্য তৈরি করবে। এর বিপরীতে এমন একজনের অবস্থান যে কিছুই করে না। ধরুন, সে খুব পাপপূর্ণ এক জীবন অতিবাহিত করছে। সে দুআ করে না, নামাজ পড়ে না, সে কিছুই করে না। তার কাছে গেলে সে বলে, আমার আল্লাহর উপর 'রজা' আছে যে, আল্লাহ্ আমাকে ক্ষমা করে দিবেন। না, এর নাম রজা নয়। এর নাম বোকামি। 'রজা' মানে আপনার কাজ-কর্ম প্রমাণ করছে যে, আপনার সত্যিকারের আশা রয়েছে। আপনি যদি সত্যিই আশাবাদী হয়ে থাকেন তাহলে এই আশা আল্লাহর সাথে আপনার সম্পর্ক উন্নত করে তুলবে, আপনি সবসময় আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইবেন। ভালো ভালো কাজ করতে থাকবেন কারণ, আপনি চান আল্লাহ্ যেন আপনাকে পুরস্কৃত করেন।
রজার পাঁচটি ধরণ নিয়ে আবার চিন্তা করে দেখুন। এই পাঁচ ধরণের আশার প্রত্যেকটি আপনার জীবনে প্রভাব ফেলবে। আপনি ভালো ভালো কাজ করবেন আল্লাহর পুরস্কারের আশায়। আপনি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইবেন এই আশায় যে, আল্লাহ্ আপনাকে ক্ষমা করে দিবেন। আপনি কিয়ামাত এবং বিচার দিবস নিয়ে চিন্তা করবেন— আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করার আশায়। এটা ইহসানের ধারণার সাথে সংশ্লিষ্ট। আপনি আল্লাহর কাছে দুআ করতে থাকবেন। সবমিলিয়ে জীবনের প্রতি আপনার দৃষ্টিভঙ্গি হয়ে উঠবে ইতিবাচক। এর নাম হলো রজা। এইজন্যই এই পরিভাষাটি কুরআন এবং সুন্নায় ব্যবহার করা হয়েছে।
তামান্নি এবং এই ধরণের অন্যান্য পরিভাষাগুলোতে এই অর্থ নেই যা সম্পর্কে এতক্ষণ আমরা কথা বলে আসছি।
তাই, আমাদেরকে নিছক বিমূর্ত আকাঙ্ক্ষা এবং খাঁটি আত্মবিশ্বাসের মাঝে পার্থক্য করতে হবে। আল্লাহ্ আজ্জা ওয়া জাল্লা হলেন রাহমান, রহিম, কারিম, মান্নান। তিনি আমাদের জীবনে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটাবেন। যা আমাদের জীবনে পরিবর্তন নিয়ে আসবে।
প্রিয় মুসলিম, ইনশাআল্লাহু তায়ালা, আমরা আল্লাহ্র কাছে দুআ করি— আগামীকাল আজকের চেয়ে উত্তম হবে। প্যান্ডামিক ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়বে, টিকাগুলো ফলপ্রসূ হবে। আমাদের এই ইয়াকিন আছে, আমাদের এই ইতিবাচক আশা রয়েছে। ইনশাআল্লাহু তায়ালা আমরা আশাবাদী যে, আমাদের মসজিদগুলো আগের মত মানুষে পরিপূর্ণ হয়ে উঠবে। আমরা আবার প্রধান হলে নামাজ পড়তে পারবো, ইনশাআল্লাহু তায়ালা। আমরা দুআ করছি, ইনশাআল্লাহু তায়ালা, খুব দ্রুত আমরা আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যাবো। জীবন আবার স্বাভাবিক হয়ে যাবে। এর নামই রজা।
এটা আমাদের মাঝে আশা জাগায় প্রতিদিন এবং প্রতিরাতে। এটা আমাদেরকে আরও উন্নত মানুষে পরিণত করে, উন্নত মুসলিমে পরিণত করে, উন্নত মানবে পরিণত করে, উন্নত নাগরিকে পরিণত করে। জীবনের সকল ক্ষেত্রে রজা ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। আমরা যত বেশি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালাকে জানবো, আমাদের রজা তত বেশি বৃদ্ধি পাবে।
আল্লাহ্ আমাদেরকে তাঁদের অন্তর্ভুক্ত করুন যারা যারা অন্তরে খাঁটি আশা পোষণ করে।
— ডঃ ইয়াসির কাদি।
Source: https://www.facebook.com/NAKBangla
Post a Comment